কলকাতা প্রেস ক্লাবে উদ্বোধন হল দন্তচিকিৎসক ডাঃ রাজু বিশ্বাসের লেখা দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক বাংলা বই ‘দাঁত সম্পর্কে দু–চার কথা যা আমি জানি’; বইমেলায় মিলবে ৬৫২ নম্বর স্টলে।
এটি ডাঃ বিশ্বাসের পেশাজীবনের প্রথম বাংলা বই। সাধারণ পাঠকের কথা মাথায় রেখে গল্পের ছলে সহজ ভাষায় দাঁত ও মুখগহ্বরের নানা সমস্যা, তার কারণ, প্রতিকার ও ভুল ধারণা ভাঙার প্রয়াস রয়েছে বইটিতে। জনসচেতনতা তৈরিই যেহেতু লেখকের প্রধান লক্ষ্য, তাই বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন—
‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা যারা দেন না, তাদের প্রতি।’
বইটিতে রয়েছে মোট ৩১টি পর্ব।
‘সচেতনতার সহজপাঠ’ দিয়ে শুরু, শেষ হয়েছে ‘যত প্রশ্ন তত উত্তর’ পর্বে। পেশাজীবনে দাঁত ও মুখগহ্বরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া ‘১০৮টি উত্তর’ রয়েছে সেই পর্বে। দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগ, দাঁত তোলা, নকল দাঁত, ইমপ্লান্ট, রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট, শিশুদের দাঁতের যত্ন, মুখের ক্যান্সার—সহ দন্তচিকিৎসার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই স্থান পেয়েছে সহজ ও পাঠযোগ্য ভঙ্গিতে। সেই সঙ্গে একাধিক পর্বে গল্পের ছলে নানা চিকিৎসাধর্মী ব্যাখ্যায় সচেতনতার স্বার্থে সচেতনভাবেই বারবার তিনি ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে সামনে এনেছেন মুখগহ্বরের সুরক্ষার এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, যাতে সেগুলি পাঠকের কাছে উপেক্ষিত না থাকে।
বইটির শুরুতেই তিনি একটি অকপট স্বীকারোক্তি করেছেন। লিখেছেন—
‘বইটি লিখতে বসে একটা নজরকাড়া নাম ভাবছিলাম। হঠাৎই মনে পড়ল সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘কুকুর সম্পর্কে দুটো-একটা কথা যা আমি জানি’। ব্যস। আর লোভ সামলাতে পারলাম না। ঠিক করে ফেললাম বইয়ের নাম— ‘দাঁত সম্পর্কে দু–চার কথা যা আমি জানি’। বাবু সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতা।’
অন্যান্য পর্বের চুম্বক–ছোঁয়া
বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ের নামেই রয়েছে মজার টান —
অবহেলায় তৈরি হওয়া দাঁতের নানা রোগ — ‘তোমারে বধিবে যে গবীরে বাড়িছে সে”
দাঁতের ক্ষয় রোগই দাঁতের বড় শত্রু — ‘ক্যাভিটি কাহারে কয়’
মাড়ি ফুলে যাওয়া, মুখে দুর্গন্ধ — ‘মাড়ি যখন অবতীর্ণ’
দাঁতে পোকা দেখানোর ভেলকি — ‘এই খোকা, তোর দাঁতে পোকা’
দাঁতের ব্যথা নিয়ে হাহাকার — ‘সে ব্যথা কী যে ব্যথা’
অকারণে দাঁত তোলার প্রবণতা — ‘ঘচাংফু’
আক্কেল দাঁত প্রসঙ্গ — ‘দুষ্ট গরু এবং শূন্য গোয়াল’
নকল দাঁত বাঁধানো — ‘ফোকলা মাড়ি, কী যে করি’
ক্যানাইন দাঁতের চরিত্র — ‘ক্যানাইন–মাহাত্ম্য’
দাঁত তোলা কি খুব কষ্টের? — ‘একটা দাঁত নষ্ট, তোলা কি খুব কষ্ট?’
জনসমক্ষে নকল দাঁত খুলে যাওয়া — ‘নকল দাঁত এবং নরপাড়া’
আগে ও এখনকার চিকিৎসা পদ্ধতি — ‘দাঁত বাঁধানোর একাল–সেকাল’
বাকা দাঁতের সমস্যা — ‘ট্যারা–ব্যাঁকা–উঁচুনিচু, দাঁত নিয়ে যত কিছু’
ডেঞ্চার প্রসঙ্গ — ‘দাঁত নিয়ে ভেঞ্চার, করে নিন ডেঞ্চার’
ব্রিজিং — ‘একতাই শক্তি’
ইমপ্লান্ট — ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’
রুট ক্যানাল — ‘নাম তার আরসিটি’
তামাক ও পানীয়ের ক্ষতি — ‘যাহা খাই, তাহা ভুল করে খাই’
শিশুদের দাঁতের যত্ন — ‘দুধের নয়, দুগ্ধ দাঁত’
অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে — ‘অভিভাবকদের বলছি’
মুখের ক্যান্সার — ‘মুখের ক্যান্সার, জেনে নিন অ্যান্সার’
দাঁতের সুরক্ষানামা — ‘৭টি সাধারণ টিপস’
জানেন কি?
প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে যেমন বাস্তুতন্ত্র আছে, তেমনই আমাদের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য মুখের ভেতরেও রয়েছে প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পূর্ণ এক শরীরতন্ত্র। তাই দাঁত ও মুখগহ্বরের যুগলবন্দি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি বড় দিক।
একটি সুন্দর হাসি যেমন অন্যকে মুগ্ধ করে, তেমনই আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করে। তাই দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যরক্ষা শুধু শরীর নয়, মনের ভালো থাকারও চাবিকাঠি।
মুখের স্বাস্থ্য খারাপ হলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ফুসফুস ও কিডনি সংক্রমণ, এমনকি গর্ভাবস্থায় জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবু অবাক করা তথ্য — ভারতে এখনও প্রায় ‘৫০% মানুষ নিয়মিত টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যবহার করেন না’।
শিশুদের ক্ষেত্রেও অবহেলা বাড়ছে। ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস কমে যাওয়া—এসব কারণে দাঁতের শক্তি ও সংখ্যা দুটোই কমছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দাঁতের বিবর্তনগত বিপদের মুখে পড়বে।
ভাবুন। ভাবতে থাকুন। আপনার সময় শুরু এখন।
লেখক পরিচিতি
ডাঃ রাজু বিশ্বাস
ডাঃ আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজ থেকে বিডিএস (অনার্স) এবং এমডিএস ডিগ্রিধারী। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। কলকাতার জনপ্রিয় ডেন্টাল ক্লিনিক ‘Smile & Beyond’ তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অবদান।
তিনি ইন্ডিয়ান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (IDA) পশ্চিমবঙ্গ শাখার রাজ্য সম্পাদক এবং সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী সদস্য। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রাক্তন সভাপতি এবং বর্তমানে ডেন্টাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার সদস্য। বহু বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মুখগহ্বর চিকিৎসা সংক্রান্ত শিবিরের সফল আয়োজক।
দেশ–বিদেশের নানা জার্নালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ও বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা দন্তচিকিৎসা মহলে সমাদৃত। চিকিৎসা জগতের বাইরে সমাজসেবামূলক কাজেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন